Friday, April 27, 2012

সংস্কার চান সৌদি প্রিন্সেস

একনজরে প্রিন্সেস বাসমা
ষ জন্ম ১৯৬৫ সালে। সৌদি আরবের দ্বিতীয় শাসকের কনিষ্ঠ কন্যা ও বর্তমান বাদশাহর ভাতিজি। পুরো নাম প্রিন্সেস বাসমা বিনতে সউদ বিন আবদুল আজিজ।
ষ স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর বর্তমানে সন্তানদের নিয়ে লন্ডনের অ্যাক্টন শহরে বাস করছেন।
পড়াশোনা করেছেন ব্রিটেন ও সুইজারল্যান্ডে
ষ ৫ সন্তানের জননী রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী
ষ সংস্কারের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর


হ ফয়সল আবদুল্লাহ
সৌদি আরবের সাবেক শাসক কিং সৌদ। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের প্রথম নারী বিশ্ববিদ্যালয়। দাসপ্রথা তুলে দেওয়ার পর দেশে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রও তৈরি করে গেছেন। কিন্তু তার মেয়ে প্রিন্সেস বাসমা বিনতে সৌদ বেশ খানিকটা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বিবিসিকে জানালেন, দেশের এখনকার অবস্থা দেখে তিনি আশাবাদী নন। কেননা বর্তমান শাসকরা আগের ওয়াদা ঠিকঠাক মানতে পারছেন না। বিবিসির সঙ্গে এ ছাড়াও কয়েকটি ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন লন্ডনপ্রবাসী বাসমা। তার ভাষ্যেই তুলে ধরা হলো বিশদ প্রতিবেদনটির সংক্ষেপিত রূপ।
পশ্চিমা ঘেঁষা নয়, নতুন কিছু চাই : এমন এক সংবিধানের স্বপ্ন দেখি, যাতে নারী-পুরুষের সমানাধিকার দেওয়া হবে। শুধু আইনের চোখে নয়, আমাদের নাগরিক নীতি কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও তেমনটা দেখতে চাই। আরেকটা উদাহরণ দিতে চাই, এখনকার বিচারব্যবস্থায় বিচারক পবিত্র কোরআনের আলোকে সিদ্ধান্ত নেন ঠিকই, তবে তাতে একান্তই বিচারকের নিজস্ব বোধ ও ধারণার প্রতিফলন ঘটে। পশ্চিমা পন্থা আসুক তা বলছি না, তবে আমাদের চাহিদা ও সংস্কৃতির আলোকে প্রচলিত পন্থার একটা নতুন রূপরেখাকে সাদরে গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ সংবিধানটা হবে পবিত্র কোরআনের আলোকে, তবে তাতে কারও ব্যক্তিগত ধারণার চর্চার জন্য তা উন্মুক্ত থাকবে না। পাশাপাশি, ওই সংবিধানে নারী, পুরুষ ও গোত্রনির্বিশেষে প্রত্যেকের সমান নাগরিক অধিকারও নিশ্চিত হবে।
নির্যাতনের আরেক নাম : বিবাহ বিচ্ছেদ আইন
আমি কঠিনভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান বিবাহ বিচ্ছেদ আইনটি নির্যাতনের আরেক নাম। এখন একজন সৌদি নারী কেবল তখুনি বিচ্ছেদ চাইতে পারে, যখন সে এর জন্য মামলা করবে। যাকে বলা হয়, 'খালি ও ধালি'। অর্থাৎ হয় ওই নারীকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হবে, নতুবা তার বিচ্ছেদের কারণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, এমন প্রত্যক্ষদর্শী খুঁজতে হবে। বিয়ের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখার জন্যই নাকি এ ধরনের কঠিন নিয়মের আবির্ভাব। আবার নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখার আরেকটি পন্থা হলো, বিচ্ছেদের পরও ছয় বছরের বড় শিশুর দেখভালের দায়িত্ব চোখ বুজে বাবাকে দিয়ে দেওয়া। এ ধরনের নিয়ম সেই কোরআনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের আইনকানুন রচিত হওয়ার কথা। অথচ সেখানে নারীদের 'বিরোধপূর্ণ পার্থক্যের' কারণেই বিচ্ছেদের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
ভয়ানক সিলেবাস : সৌদি আরবে নারীদের এখন যে চোখে দেখা হচ্ছে তার জন্য অনেকাংশে দায়ী এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা। সিলেবাসে যা আছে তা এককথায় ভয়ঙ্কর। শিশুদের শেখানো হচ্ছে, নারীরা সমাজের নিচুস্তরের মানুষ। তাদের কাজ হলো শুধু পরিবারের দেখাশোনা ও সন্তান লালনপালন। তাদের আসলে এটাই শেখানো হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তার পর যদি নারীদের কারও প্রার্থনা করতে হতো, তবে সে হতো পুরুষ। আবার এটাও বলা হয়, স্বামীর ইচ্ছা পূরণ না করলেই ফেরেশতারা সমস্বরে অভিশাপ দিয়ে যাবে স্ত্রীকে। মেয়েদের শারীরিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। অথচ এর সবই কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা। আমি মনে করি, কোরআন আর সুন্নাহ মেনে চলাই শ্রেয়। বাকি থাকা অজস্র ভুল ব্যাখ্যা শেখার পর আমাদের তরুণরা নিশ্চিতভাবে সন্ত্রাসবাদের দিকেই ঝুঁকবে। তাদের মুখস্থবিদ্যা ছেড়ে সৃষ্টিশীল পথে নিয়ে আসা উচিত। অতীতের ইসলাম ছিল সৃষ্টিশীলতায় মুখর। বিজ্ঞান ও সাহিত্যে ধর্মবেত্তাদের পদচারণা ছিল উজ্জ্বল। আমাদের ধর্ম এমন কিছু নয় যে, একে ঢাল বানিয়ে আমরা বিশ্ব থেকে আমাদের গা বাঁচিয়ে চলব। বরং এটা দিয়ে আমরা এগিয়ে গিয়ে আমাদের চারপাশে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারি।
আত্মহত্যাই শ্রেয়! : সমাজকল্যাণমন্ত্রী নারীদের রক্ষা করা নিয়ে তো কিছু করছেনই না, উল্টো নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতার বিষয়ে চুপ করে আছেন। নির্যাতন থেকে বাঁচতে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের এটাই বলা হয় যে, আশ্রয় চেয়ে তারা তাদের পরিবারকে লজ্জায় ডুবিয়েছে। ক্ষমতাধর পরিবার থেকে এলে ওই নারীকে সোজা আবার সেই বাড়িতেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যার পরিণতিতে আমরা অনেক আত্মহত্যা দেখেছি। অনেক ডাক্তার ও শিক্ষিকার মতো উচ্চশিক্ষিত নারীরাও নির্যাতনকারীর কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আমাদের এখন প্রয়োজন নারীর স্বাধীন আশ্রয়, যা শক্তিশালী আইনের হাত ধরে টিকে থাকবে, যে আইন পারিবারিক ঐতিহ্যকেও উপেক্ষা করতে পারবে। সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কারণে যে নারীরা কেবল নির্যাতিত হচ্ছে তা নয়, এর কারণে সৌদি আরবে দারিদ্র্যও বেড়ে চলেছে। বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের অর্ধেক লোকই দারিদ্র্যপীড়িত, যার অন্যতম কারণটা হলো স্রেফ দুর্নীতি।
এখনই ড্রাইভিং নয় :সৌদি আরবে মাহরাম (পুরুষ আত্মীয়) ছাড়া নারীর বাইরে বের হওয়া নিষেধ। মোহাম্মদ (সা.)-এর সময় নারীরা পুরুষ সঙ্গী নিয়ে বের হতো, কেননা আরব তখন মরুময় ও দস্যুতে ভরা ছিল। এখন এ নিয়মটা আমার কাছে নারী অধিকার হরণ ছাড়া আর কিছু নয়। এতে শুধু নারীর শক্তিমত্তাকে অবমূল্যায়নই করা হচ্ছে না, পাশাপাশি সমাজ ও পুরুষদের ওপর বাড়তি বোঝাও চাপানো হচ্ছে। এখনও এ দেশে নারীদের গাড়ি চালানো নিষেধ। আমি অবশ্যই এর বিরোধী, তবে এখনও নারীদের গাড়ি চালানোর সময় আসেনি। কেননা এখন চালাতে গেলে ওই নারীকে পাকড়াও করা হবে, মারধর করা হবে, এমনকি তাকে শিক্ষা দিতে আরও জঘন্য কিছুও হতে পারে। আর তাই বলব, আমরা পর্যাপ্ত শিক্ষিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নারী যেন গাড়ি না চালায়। ততদিন পর্যন্ত যেন না চালায়, যতদিন না গাড়ি চালানোয় বাধা দেওয়ার মতো পাগলামির বিরুদ্ধে শক্ত আইন হচ্ছে। আর এর আগে গাড়ি চালিয়ে যদি কেউ লাঞ্ছিত বা নির্যাতিত হয়, তবে চরমপন্থিরা অন্য দেশের নারীদের বলার মতো সুযোগ পেয়ে যাবে, তারা তখন হেঁড়ে গলায় বলে বেড়াবে, দেখ! নারীদের গাড়ি চালানোর ফল কী হতে পারে! আর তাই আগে মৌলিক আইনের সংস্কারটাই বেশি করে কাম্য।

Reference: Dainik Somokal. Date: 27 April, 2012.
Please Click Here
http://www.samakal.com.bd/details.php?news=58&action=main&menu_type=&option=single&news_id=254756&pub_no=1036&type=